রাঙ্গামাটিতে রাঙ্গা ভ্রমণ (একটি ভ্রমণ কাহিনী)

saiful bin a kalam

Saiful bin A. Kalamঅফিসে বসেই কাজ করছিলাম, হঠাৎ আমার বন্ধু আব্দুল আহাদ ফোন করে জানতে চাইল রাঙ্গামাটি ভ্রমণে যাব কিনা, চট্টগ্রাম কলেজ মাস্টার্স ব্যাচ থেকে সবাই মিলে রাঙ্গামাটি ভ্রমণে যাচ্ছে। আধাঘন্টা সময় নিয়ে অফিসে ছুটির ব্যাপারে আলাপ করে এনশিউর করলাম যাব। পরের দিন ৭টায় কলেজের হোস্টেল গেইটে উপস্থিত হওয়ার কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বাসা হয়ে বন্ধু দেলওয়ার এর দোকানে (চকবাজার) গেলাম ঈদ পরবর্তী সাক্ষাতের জন্য। কথা পর্যায়ে তাকে বললাম রাঙ্গামাটি ট্যুার এর কথা সেও যেতে আগ্রহী হল, আহাদ ভাইকে ফোন করে সেটাও কনর্ফাম করলাম। কাল ভোর ৫টায় উঠতে হবে সবাইকে কারন নামাজ, গোসল ও অন্যান্য কার্যাদি সেরে সকাল ৭টায় কলেজ হোস্টেল গেইটে পৌঁছাতে হবে। ভোর ৫টায় ঠিকই মোবাইল রিং বেজে উঠল, দেখি আহাদ ভাইয়ের ফোন। উঠার কথা বলে আবারও আধাঘন্টা ঘুমালাম। দেলওয়ারেকে ডেকে দিলাম। সব কাজ সেরে বের হওয়ার আগমুহূর্তে ভাবি চা তৈরি করে দিল। চা-বিস্কুট খেয়ে ভাবিকে সালাম করে বেরিয়ে পড়লাম। আহাদ ভাইকে সাথে নিয়ে রিক্সায় চড়ে সোজা হোস্টেল গেইট। দেলওয়ার ইতোমধ্যেই হাজির। আমরা যথাসময়ে পৌঁছলেও গাড়ি ছাড়তে প্রায় ৮টা বেজে গেল। গাড়ির নাম লুলু। তো রওয়ানা হলাম লুলু বাসে করে অক্সিজেন হয়ে হাটহাজারি হয়ে রাঙ্গামাটির দিকে। চারদিকে পাহাড়ঘেরা উচুঁ নিচু আর আঁকা-বাঁকা পথ দেখতে লাগলাম। গাড়িতে অনেকে গান গেয়ে, হাসি টাট্টা আর হৈ হোল্লোড করে মজা করতে লাগল। নিজের মধ্যে হেসে, গেয়ে, নেচে অনেক মজা করার অভ্যাস থাকলেও সবাই যেহেতু সিনিয়র বড় ভাই তাই এসব করত ইচ্ছে করেনি। চুপচাপ বসে বাইরের প্রকৃতি দেখতে থাকি ও কিছুটা দেলওয়ার এর সাথে গল্পও করি এবং বাকিদের গান আর হৈ হোল্লোড উপভোগ করি। রাঙ্গামাটি সদরে পৌঁছলাম সম্ভবত ১১:৩০টায়। সেখানে হোটেলে দুপুরে খাওয়ার অর্ডার ও এডভান্স করা হল। আমরা ২৫ জন ছিলাম। আগে থেকেই ভাড়া করা ছিল একটি দোতলা বুট। চড়ে বসলাম কেউ উপরে কেউ নিচে। রওয়ানা হলাম শুভলং জলপ্রপাতের দিকে। এই ফাঁকে একটু রাঙ্গামাটির বিশদ পরিচয় তুলে ধরি…

রাঙ্গামাটি হল চট্টগ্রাম বিভাগের একটি জেলা। এটি আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জেলা। এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে বেশ পরিচিত। বাংলাদেশের একমাত্র জেলা যেটার সাথে ভারত ও মায়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। এটি চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এর মোট আয়তন ৬১১৬.১৩ বর্গ কি.মি.। সেখানে ৫২ শতাংশ লোক উপজাতি আর বাকি ৪৮ শতাংশ বাঙ্গালী। উপজাতিদের মধ্যে আছে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, মুরং, রাকাইন, লুসাই ও তানচাংগা ইত্যাদি। এর দশটি উপজেলা রয়েছে যেগুলি হল…
saiful bin a kalam
  1. Baghaichhari
  2. Barkal
  3. Kawkhali
  4. Belaichhari
  5. Kaptai
  6. Juraichhari
  7. Langadu
  8. Nannerchar
  9. Rajasthali
  10. Rangamati sadar
রাঙ্গামাটিতে আছে পাহাড়, বন, নদী, লেইক আর সমতল ভূমি। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এটি একটি অন্যতম জায়গা। এই জায়গাটি বেশি বিখ্যাত হওয়ার কারণ এতে রয়েছে…
  1. সুন্দর সুন্দর পাহাড়
  2. কাপ্তাই লেক
  3. শুভলং ঝর্ণা
  4. ঝুলন্ত ব্রিজ
  5. উপজাতি সংস্কৃতি জাদুঘর
  6. চাকমাদের রাজবাড়ি
  7. বুদ্ধদের রাজবনবিহার প্যাগোড়া
  8. পেদা টিং টিং
  9. কাপ্তাই জাতীয় পার্ক
  10. ডিসি বাংলো ইত্যাদি
 saiful bin a kalam
রাঙ্গামাটির প্রধান আকর্ষণ হল কাপ্তাই লেকে বোটে চড়ে শুভলং ঝর্ণা, পেদা টিং টিং, ঝুলন্ত ব্রিজ দেখতে যাওয়া, পাহাড়ে অনেক উচুতে ওটে ঘাম ঝরানো এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা ও উপজাতিদের জীবন স্টাইল দেখা।
তো বুটে চড়ে যেতে লাগলাম শুভলং জলপ্রপাত। প্রায় আড়াই ঘন্টার পথ। লেকের মধ্যে পানি আর পানি, চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা আর লেকের মাঝে মাঝে ছোট ছোট দ্বীপের মত পাহাড়, এরকম কিছু কিছু পাহাড়ে ঘর বাড়িও আছে, যারা নৌকা নিয়ে চলাফেরা করে। লেকের পাশ ঘিরেও অনেক জনবসতি আছে। নীল রং এর পানির এই লেকটি মানুষেরই তৈরি, প্রাকৃতিক নয়। চলতে চলতে এক সময় পৌঁছলাম কাঙ্খিত সেই ঝর্ণায়। চারিদিকে উঁচু উঁচু পাহাড় আর পাহাড়। একটা পাথরের পাহাড়ের গাঁ বেয়ে নেমে এসেছে সেই জলপ্রপাত। দুই-তিন ভাগ হয়ে পানি পড়ছে, কোন ভাগে বেশি আবার কোন ভাগে কম। পানির গতিও কখনো বেশি বা কখনো কম। ঝর্ণার কাছে যেতে হলে কিছু হালকা কাঁদা পানি দিয়ে যেতে হয়। তারপর আস্তে আস্তে করে খুব সাবধানে পাথরের পাহাড় বেয়ে ঝর্ণার পানি ছুঁতে হয়। আমাদের প্রায় অনেকে দূর থেকে ছোট ঝর্ণা দেখে ভিজতে রাজি হয় নাই। আমি আগে থেকেই তৈরি হয়ে গিয়েছিলাম ঝর্ণায় গোসল করার জন্য। থ্রী কোয়ার্টার পড়ে নেমে পড়লাম। অতি সাবধানে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্ণার পানির দ্বারে গেলাম। ভিজিয়ে দিলাম নিজেকে ঝর্ণার মিস্টি পানিতে। আহ্ কি শান্তি। গরমে শান্তির ছাঁয়া। অনেকক্ষণ ভিজার পর চলে আসলাম। শরীর মুছে আরেক জোড়া জামা গাঁয়ে দিলাম। উঠে পড়লাম বুটে। এবার যাত্রা হল, বরকল উপজেলা ও ফিদা টিং টিং হয়ে সেই কাংখিত ঝুলন্ত ব্রিজ। বরকল উপজেলায় তেমন কিছু নেই, আছে শুধু উঁচু পাহাড়, চাইলে ওঠা যায়। আমরা একটু থেমে আবার চলে আসলাম বুটে রওয়ানা হলাম ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে। পথিমধ্যে ফিদা টিং টিং কিন্তু পেটে ক্ষিদের চাপ বেড়ে যাওয়াই সবাই না নামার সিদ্ধান্ত নিল। তখন বেলা প্রায় সাড়ে তিনটা। ঝুলন্ত ব্রিজ গিয়ে দেখি এতো ডুবন্ত ব্রিজ। বর্ষা কাল হওয়ায় লেকে পানি বেশি হওয়াতে ব্রিজ পানির নিচে ডোকে গেছে।
বুট এসে থামল ডিসি বাংলোতে। মোটামুটি সুন্দর জায়গা, পেটে ক্ষিদে না থাকলে হয়তো আরো সুন্দর লাগত। ক্ষিদের কারনে তখন কিছুই ভাল লাগছিল না। কিছুক্ষণ ছবি তুলে, ঘোরে একটু হেটে চলে আসলাম গাড়ির কাছে। গাড়ি করে রওয়ানা হলাম সেই জায়গায় যেখানে খাবারের অর্ডার করা হয়েছিল। সবার প্রচন্ড ক্ষিদে পাওয়ায় খাবারের সময় ঝড়ের গতিতে টানলাম খাবার। ভাত আনতে তরকারি শেষ, তরকারি আনতে ভাত শেষ এই অবস্থা। অবশেষ আবার ফিট হলাম জার্নি করার জন্য কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। অন্যসব দেখার সময় আমাদের হাতে নেই। তারপরেও অনেকে সি.এন.জি নিয়ে বৌদ্ধ মন্দির দেখতে গিয়েছিল। আমরা গাড়িতে রেস্ট নিলাম। সবায় আসার পর রওয়ানা হলাম চট্টগ্রামের পথে। গাড়িতে একইভাবে চলল গান, হৈ হোল্লোড আর মজা।

ফটো গ্যালারী – রাঙ্গামাটি

Save

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s