বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল বিস্তারিতভাবে আলোচনা কর

ভূমিকা: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ই জুন ভগিরতি নদীর তীরে পলাশীর আম বাগানে বাংলা, বিহার ও উডিষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে এ ভারতীয় মহাদেশে ইংরেজদের শাষনের গোডাপত্তন হয়। তৎকালীন বাংলা, বিহার, উডিষ্যা, আসাম ও আরো কিছু অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছিল বাংলা প্রেসিডেন্সি। এর আয়তন বিশাল হওয়াই পুরো বাংলা প্রেসিডেন্সিকে একসাথে শাষন করা ব্রিটিশদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন (যার নামে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল) এ অঞ্চলের বড় লাট সাহেব হয়ে আসলে তিনি বাংলাকে বিভাজন করার সিদ্ধান্ত নেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯০৫ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর বঙ্গভঙ্গ করে রাজশাহী, ঢাকা, চট্ট্রগাম ও আসামকে নিয়ে গঠিত করেন পূর্ব বঙ্গ যার রাজধানী হয় ঢাকা। এ সময় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ঢাকার নওয়াব সলিমুল্লাহ সহ অনেক মুসলিম নেত্রিবৃন্দের সমর্থন লাভ করেন যদিও হিন্দুরা এর ঘোর বিরোধিতা করেছিল।

বঙ্গভঙ্গের কারণ: বঙ্গভঙ্গের মূল যে কারণ তা হল, বাংলা প্রেসিডেন্সির বিশাল আয়তন হওয়ার কারণে ব্রিটিশরা এদেশেকে শাসন-শুষনে বেশি সুবিধা করতে পারছে না। অপরদিকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (আই.এন.সি) ব্রিটিশ বিরোধী বিভিন্ন কার্যকলাপকে থামিয়ে দিতে বাংলাকে বিভাজন করার প্রয়োজন মনে করেন। এর পরেও বঙ্গভঙ্গের পেছনে আরো সুদূর প্রসারি কারণ আছে যা নিচে উল্লেখ করা হল….।

প্রশাসনিক কারণ: রাষ্ট্রবিজ্ঞানিগণ মনে করেন বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ হল প্রশাসনিক কারণ। বাংলা ছিল বিশাল প্রদেশ যার আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল। ফলে শাসনভার ছিল কষ্টসাধ্য। লর্ড কার্জন প্রথম থেকেই একে প্রশাসনিক সংস্কার নামে অভিহিত করেন।

কংগ্রেসকে দুর্বল করা: ১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় জনগনের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। শুরু থেকেই ব্রিটিস বিরোধীভাবাপন্ন হলেও বঙ্গভঙ্গ যখন প্রস্তাব হয় কংগ্রেস তখন থেকেই এর বিরোধিতা করেন। কার্জন বিশ্বাস করতো কলকাতায় কিছু ষড়যন্ত্রকারী আমার বক্তব্য কংগ্রেসে চালাতো। কাজেই কলকাতার গুরুত্ব হ্রাস করে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করলে ষড়যন্ত্রকারীরা সে সুযোগ আর পাবে না। তারা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ: ব্রিটিশ সরকারের যতো উন্নয়ন সব হতো ভারতের রাজধানী কেন্দ্রীক। তুলনামূলকভাবে পূর্ব বংলার জনগণ অবহেলিত হতো। যেহেতু এ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম তাই মুসলিমরা হিন্দুদের তুলনায় সুযোগ সুবিধা কম পেত। তাই দুই বাংলার মানুষ বিশেষকরে মুসলিমরাও যাতে তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পায় সেজন্যই মূলত বাঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সরকারি চাকরিতে সমস্য: সে সময়ের হিন্দুরাই সবচেয়ে বেশি সরকারি চাকরির সুবিধা পেত। এক্ষেত্রে মুসলিমরা ছিল পিছিয়ে। মুসলিমরা যাতে সমানভাবে সরকারি চাকরি করতে পারে এ জন্য বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। ঢাকার নওয়াব সলিমুল্লাহ সহ প্রায় সব মুসলিম নেতাগণ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল।

পাটের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্য: পূর্ব বাংলায় পাট উৎপাদন হতো বেশি কিন্তু পাটকল ছিল না। পাটকল ছিল কলকাতায় ও হুগলিতে। এ জন্য পূর্ববাংলার জনগণ পাটের উপযোক্ত মূল্য পেত না। এ জন্য পূর্ব বাংলার জনগন বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিল। আর পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতেই বঙ্গভঙ্গ করা হয়েছিল।

সাইফুল বিন আ. কালামবঙ্গভঙ্গের ফলাফল: বঙ্গভঙ্গ যে লক্ষ্যে করা হয় তার পুরোপুরি বাস্তবায়তি হয় নি বা হতে দেইনি তৎকালীন হিন্দু শ্রেণি বা হিন্দু নেত্রীবর্গ। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের শুরুতে এর বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ, বাংলা পত্রপত্রিকা, ভারত ও ইংল্যান্ডের ইংরেজি পত্রিকাগুলো প্রতিবাদ করে। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহকে ইংরেজরা স্বপক্ষে আনতে সক্ষম হলেও, বাংলার সমগ্র মুসলমান সমাজকে আনতে পারে নাই। ১৯০৫ সালের জুলাই মাসের ভিতরে এই আন্দোলনে স্থানীয় জমিদার এবং সাধারণ প্রজাদের সাথে চরমপন্থী দলগুলোও শরিক হয়ে উঠে। ১৯০৫ সালের ১৭ই জুলাই খুলনাতে এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ  ব্রিটিশ পণ্য বয়কটের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ক্রমান্বয়ে এই আন্দোলন ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী অন্দোলনে রূপ লাভ করে। এই সময় ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ বিভেদ নীতি দিয়ে মুসলমানদেরকে এই আন্দোলন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে, ব্রিটিশরা ব্যর্থ হয়।

—১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার রাজাবাজারে মুসলমানদের এক বিরাট সভায় এই আন্দোলনের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। ক্রমান্বয়ে এই আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠলে— ব্রিটিশ সরকার কার্লাইল সার্কুলার জারি করে ছাত্রদের সভাসমিতি হরতাল নিষিদ্ধ করা হয়। এর প্রতিবাদে বাংলার যুবসমাজ নভেম্বর মাসে এ্যান্টি-কার্লাইল সার্কুলার সোসাইটি গঠন করে। অবশেষে ১৯১১ খ্রিস্টব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়।

লেখাটি পিডিএফ আকারে পেতে এখান থেকে ডাউলোড করে নিন। স্লাইড আকারে দেখতে এখানে আসুন

লেSave

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s