শশাঙ্ক থেকে বঙ্গবন্ধু । (603-1975) 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বাংলা অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন রাজা শশাঙ্ক যিনি 603 থেকে 637 সাল পর্যন্ত আমৃত্যু বাংলাকে শাষন করেছেন। তার সাম্রাজ্যের বিসতৃতির সঠিক ধারণা পাওয়া না গেলেও প্রাচীন বাংলা বলতে আমরা বুঝি পশ্চিম বঙ্গ যা আজকের কালকাতা আর আসাম, ত্রিপুরার কিছু অঞ্চল, বিহার, উডিস্যা ও পূর্ববাংলা তথা আজকের বাংলাদেশ যা তখন গৌড় বলে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ শাষনামলে বাংলাভাষী অঞ্চল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি নামে পরিচিত ছিল। শশাঙ্কের মৃত্যুর সাথে সাথে তার রাজ বংশেল পতন ঘটে এবং বাংলায় শুরু হয় এক অরাজক পরিবেশ যা ইতিহাসে মাৎস্যন্যায় নামে পরিচিত।

মাৎস্যন্যায় বা বাংলার অরাজক অবস্থা:

গৌড় শাষক শশাংকের মৃত্যুর পর বা তার রাজ বংশের পতনের পর বাংলায় আর কোন কেন্দ্রেীয় শাষক ছিলেন না। সমগ্র বঙ্গে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছোট ছোট রাজ্যের সৃষ্টি হল যা শাষন করত কিছু অত্যাচারি দুর্বল শাষক। বঙ্গের জনগনের উপর নেমে এসেছিল সীমাহীন দুঃখ দুর্দশা। জোর যার মুল্লুক তার এই নীতিতে দেশ চলছিল। যে বা যারা জোর খাটাতে পারত সেই ছিল সেখানকার অধিপতি। অভিভাবকহীন সন্তান যেমন বেপরোয়া চলে, যা ইচ্ছা তাই করে বেড়ায় ঠিক তেমনি বাংলার জনগনও অভিবাবকহীন হয়ে যে যার মত করে চলতে লাগল যা ইতিহাসে মাৎস্যন্যায় বলে পরিচিত। মাৎস্যন্যায়ের স্থায়ীত্বকাল ছিল 150 বছর বা 787 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

পাল রাজবংশ:

মাৎস্যন্যায় সময়ের ভয়বহতা উপলব্ধি করে বাংলার জনগন গোপাল নামক এক সামন্ত রাজাকে নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজা হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই থেকে শুরু হয় পাল রাজবংশের। গোপালই পাল রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। গোপাল রাজ বংশের শক্তিশালি দুই রাজা ছিলেন যথক্রমে ধর্মপাল ও দেবপাল। পাল বংশের স্থায়ীত্বকাল ছিল প্রায় 400 বছর।

সেন রাজবংশ:

ইতিহাসের চিরায়িত নিয়ম অনুসারে প্রতিটা জাতি বা গোষ্ঠিরই উত্থান যেমন আছে আবার পতন একইভাবে অনিবার্য। তারই ধারাবাহিতকায় পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বারেন্দ্র ‘সামন্তচক্রের’ বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অবশেষে বাংলার পাল রাজবংশের রাজা মদনপালের রাজত্বকালে স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘটান। বাংলায় সেন শাসনের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, সেনগণই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাংলার সেন বংশীয় রাজাদের মধ্যে বিজয় সেন, বল্লাল সেন, ও লক্ষ্মণ সেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করছেন।

সেন রাজবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বিজন সেন হলেও মূল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন সামন্ত সেন ও হেমন্ত সেন। পরে হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেনই সেন রাজবংশের বিস্তিৃতি ঘটান। অবশেষে বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন রাজা ছিলেন সেন বংশেরেই লক্ষন সেন। এর পরই বাংলায় শুরু হয় মুসলিম শাষন

মুসলিম শাষন:

ভারতীয় উপমহাদেশে 712 খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাষনের শুরু হলেও বাংলায় মুসলিম শাষন আসে 1204 সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির হাত ধরে।  তিনিই প্রথম 17 মতান্তরে 18 জন ঘোড় সওয়ারী সন্য নিয়ে তখনকার বাংলার রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করে রাজা লক্ষণ সেনকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে ও এ দেশে মুসলিম শাষনের পথ সুগম করেন। তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশে বহির্জগত থেকে যেসব মুসলমান আগমন করেছিলেন, তাদেরকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এক শ্রেণির মুসলমান ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগমন করে ইসলামের বাণী প্রচার করেন। অনুরূপভাবে আসেন কিছু ফকির ও অলি-দরবেশ। তারাও কেবল ধর্ম প্রচারের কাজে জীবন অতিবাহিত করেন এবং এ অঞ্চলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজ নিজ চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি অনুসারে ইসলাম প্রচারকারী এসব অলি দরবেশদের অনেকেরই মাজার রয়েছে বাংলাদেশে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনঃ হযরত শাহ জালাল (রহঃ), হযরত শাহ পরান (রহঃ), হযরত মোহসেন আউলিয়া (রহঃ), হযরত শেখ ফরীদ (রহঃ), হযরত গরীব উল্লাহ শাহ (রহঃ), হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ) সহ আরো অনেক অলি আউলিয়া । আর এক শ্রেণির মুসলমান এদেশে এসেছিলেন দেশ জয়ের অভিযানে। তাঁদের বিজয়ের ফলে বাংলা অঞ্চলে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয়।

কথিত আছে যে, তৎকালীন হিন্দু শাষিত বাংলায় রাজাদের সাথে প্রজাদের দূরত্ব ছিল আকাশ সম বা এর চেয়েও বেশি। রাজ দরবারে কি হচ্ছে তা নিয়ে প্রজাদের যেমন মাথাব্যথা নেই ঠিক তেমনি প্রজারা কেমন আছে তা নিয়েও রাজাদের কোন তৎপরতা ছিল না। সেন রাজারা প্রজাদেরকে (হিন্দুদের) প্রধান তিনভাগে ভাগ করে নিয়েছেন ব্রহ্মন, কত্রিয় ও শুদ্র নামে। ব্রহ্মণরা উচু বংশ বলে বিবেচিত হত এবং তারা সমাজের কর্তৃস্থানীয় লোক ছিলেন। কত্রিয় জনগোষ্ঠি মধ্যম অবস্থায় থাকলেও শুদ্রদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারপ ও নাজুক। তারা সমাজের সর্বত্র নির্যাতিত ও নিপীড়িত ছিল।

অনেকের জানার আগ্রহ থাকতে পারে শতভাগ হিন্দু অঞ্চল এই বাংলায় এত মুসলিম কীভাবে আসল! মহানবীর (সা.) আগমনের আগে তো কেউই মুসলিম ছিলেন না, তাহলে বিশ্বে এত মুসলিম কীভাবে হলো! যখনই কোন জাতি অধপতনের নিম্নস্থরে পৌঁছে যায়, অন্ধকারে সমাজ নিমজ্জিত হয় ঠিক তকনই আল্লাহ পাক সেই সময়ে, সেই স্থানে তাঁর দূত অর্থাৎ নবী রাসূল প্রেরণ করে শান্তি ও সাম্যের বাণি ছড়ান। আমরা অনেকে আইয়্যামে জাহিলিয়াত তথা অন্ধকার যুগ সম্পর্কে পড়েছি যে নবী (স.) আগমন পূর্ব অবস্থা সেখানে কেমন ছিল, কতটা ভয়াবহ ছিল! বাংলায়ও যখন প্রজাদের উপর নির্যাতনের শেষ মাত্রাটুকুও বাকী ছিল না, সমগ্র বাংলা জুড়ে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছিল ঠিক তখনি সাধারণ জনগনকে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে এ দেশে অলি-আওলিয়াগণ, বণিক সম্প্রদায় ও ইসলামি বীর শাষকরা এসেছেন। যখনই মানুষ দেখল ইসলাম এমন একটা ধর্ম যেখানে মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই, বংশের কোন মর্যাদা নেই, বাহুবলের কোন স্থান নেই, সকল মানুষ এক সমান, তখনই সাধারণ জনগণ তথা নিম্ন শ্রেণিরা আস্তে আস্তে ইসলামের ছায়তলে আশ্রয় নিল। এভাবে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল।  তাইতো বখতিয়ার খলজি যখন নদীয়া আক্রমণ করল তখন সাধারণ জনগণ কোনভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে নি। সাধারণ জনগণ সাথে থাকলে কোন শক্তিই টিকতে পারে না, যার বড় প্রমাণ সদ্য তুরস্কে ঘটে যাওয়া বিফল সেনা কু। জনগণের প্রতিরোধে কীভাবে প্রেসিডেন্ট এরদোগান শত্রুর মোকাবেলা করলেন!

ইংরেজ শাসন:

এরপর প্রায় 600 বছরের কাছাকাছি সময় অর্থাৎ 1757 সাল পর্যন্ত এ দেশে মুসলিম শাষন অব্যাহত ছিল। 1757 খ্রিস্টাব্দের 23 জুন পলাশির আম বাগানে ভগিরতি নদীর তীরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্ দোলার মৃত্যুর মাধ্যমে এ দেশে ইংরেজ শাসনের উন্মেষ হলো। মীর জাফরের মীর জাফরীরর কারণে বাংলা তথা পুরো ভারতবর্ষ হারালো তাঁর স্বাধীনতা।

দীর্ঘ ১৯০ বছর (১৭৫৭) ব্রিটিশদের গোলামীর পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজন হয়ে জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্থান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। ক্লিপটনের মনগড়া সীমান্ত নির্ণয়ে তৈরি হলো ভারত ও পাকিস্থানের বির্তকিত ভূখন্ড। হিন্দু-মুসলিম চলমান দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলেই এই দেশ বিভাজন। কিন্তু এটা কি ফেয়ার হয়েছে? লাকো মানুষ (হিন্দু-মুসলিম) হারিয়েছে তাদের পৈতৃক নিবাস শুধু মাত্র ভিন্ন ধর্মালম্বী হওয়ার কারণে। সেদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও এ.কে ফজলুল হকের মত বাঙালী নেতৃবর্গ থাকার পরও বঙ্গবন্ধুর মত বলিষ্ট, উদার ও সাহসীক নেতার অভাবে বঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশ বিভাজনের পক্ষে তেমন কেউ অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেনি যদিও তাঁরা মনে-প্রাণে চেয়েছিল জাতীয়তার ভিত্তিতে দেশ বিভাজন করার। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমরা কোন ধর্মের ভিত্তিতে বা ধর্মীয় কারণে পাকিস্থানের সাথে যুদ্ধ করিনি। আমরা যুদ্ধ করেছি আমাদের অধিকার আদায়ের জন, বাঙালী জাতির অধিকার আদায়ের জন্য। কে হিন্দু বা কে মুসলিম সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়, আমরা শুধু এটুকুই বুঝি যে আমরা বাঙালি, আমরা বাংলা মায়েল সন্তান।

১৯৪৭-এর দেশ বিভাজন ধর্মের ভিত্তিতে না হয়ে জাতয়িতাবাদের ভিত্তিতে হলে আজকে বাংলার ভূখন্ড অন্য রকম হতো। পশ্চিম বাংলা অন্তত আমরা হারাতাম না। হিন্দু-মুসলিম কেউই মানবতার উর্ধ্বে নয়। আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা মানুষ আমাদের মানবিকতা আছে, আমরা বঙালি আমাদের নিজস্ব স্বকিয়তা আছে। এই উদারপন্থৗ নীতি গ্রহণ করতে পারলে তার সুফল আজকে সবায় পেত। যদিও ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে।

ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্য তাই ধর্মের দোহায় দিয়ে মানুষকে ভিটে ছাড়া করা এটা যেমন মানবিক দিক বিবেচনায় পরিত্যাজ্য ঠিক তেমনি ধর্মের দিক বিবেচনায়ও পরিত্যাজ্য। একটা মানুষ আরেকটা মানুষের সাথে, একটা জাতি আরেকটা জাতির সাথে বা এক দেশের মানুষ আরেক দেশের মানুষের সাথে ভিন্ন মত থাকতেই পারে, তাই বলে তাকে ঘৃণা করা এটা ধর্ম বা মানবিকতার কোনটাতেই যায় না। এ দেশ স্বাধীন হয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। এ দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে হিন্দু-মুসলিম সবায় মিলেমিশে যদিও হিন্দুদের অংশগ্রহণ ১%ও পড়েনা, এটা ইতিহাসের কথা। তুবও আমরা বলব এ দেশ অসাম্পদায়ীক, সবায় মানুষ হয়ে বাছতে চায়। পাকিদের অত্যাচার থেকে বাঁছার জন্য অনেক হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছে এ দেশের মুসলমানরা। আবার এও মিথ্যা নয় কিছু কিছু বিপদগামী মুসলিম বা দাপুটে নের্তৃবর্গ হিন্দুদের উৎকাতে পাকিদের সহায়তা করেছিল ও তাদের ভিটে-মাটি দখল করেছিল। তবে যারা এই ঘৃণ্য কাজ করেছিল তারা শুধু নামধারী মুসলিম তারা প্রকৃতপক্ষে বেঈমান ও শয়তানের দুসর। এক্ষেত্রে পাকিস্থানের আব্দুস সাত্তার এধির কথাই বলি যিঁনি ১৬০০০ অবঞ্চিত শিশুর পালক পিতা। এই ১৬০০০ শিশু কে কোন ধর্মের সেটা বিবেচ্য বিষয় ছিল না তাঁর কাছে। চরমপন্থি মুসলিমরা একবার এধিকে বলেছিল যে আপনি আপনার এ্যাম্বুলেন্সে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের তুলেন কেন? তিনি উত্তর দিয়েছিনে যে, আমার এ্যাম্বুলেন্স তোমাদের চাইতে বেশি মুসলমান তাই। কারণ প্রকৃত মুসলিমরা বা যেকোন ধার্মিক ব্যক্তি মানুষকে শুধুমাত্র মানুষ হিসেবেই দেখে। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। যে কেউ যে কাউকে দাওয়াত দিতেই পারে তবে সেটা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোন জোর-দবস্তি করা যাবে না।

আওয়ামী মুসলিম লীগ বা পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ তথা বঙ্গবন্ধুই ছিল এ দেশের একমাত্র কর্ণধার। পূর্ববাঙালার অবহেলিত নির্যাতিত মানুষের জন্য রাজনীতি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামীলীগ। এ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তথা বাংলাদেশের ইতিহাস বানেই বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর সেই সাহসী ও সঠিক নেতৃত্ব না থাকলে হয়তো দেশ কোন দিনই স্বাধীন হতো না বা হলেও পিছিয়ে যেতো আরো অনেক বছর। আবার বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষ ও অন্যান্য নেতারা না থাকলেও বঙ্গবন্ধু একা এ দেশকে স্বাধীন করতে পারতেন না। তাই সবায়কে যার যার মত করে মূল্যায়ন করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর সেই অগ্নিঝরা ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আজও বাঙালীকে প্রেরণা যোগায়:

“ ভায়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামীলীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়; ২৩ বৎসরের করণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস-এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ এর আন্দোলনে আয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গনতন্ত্র দেবেন – আমরা মেনে নিলাম। তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেলো, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলা নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলিতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনও যদি সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরো আলোচনা হবে। তারপরে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, তাদের সঙ্গে আলাপ করলাম- আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলা দেয়া হবে। যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। তারপরে হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো। ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করে দেয়ার পরে এদেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল। আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিলো। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। কী পেলাম আমরা? আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্র“র আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বির”দ্ধে- তার বুকের ওপরে হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুর”- আমরা বাঙালীরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। টেলিফোনে আমার সঙ্গে তার কথা হয়। তাঁকে আমি বলেছিলাম, জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের ওপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার কর”ন। তিনি বললেন, আমি নাকি স্বীকার করেছি যে, ১০ই তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে। আমি তো অনেক আগেই বলে দিয়েছি, কিসের রাউন্ড টেবিল, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার ওপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষের ওপরে দিয়েছেন। ভায়েরা আমার, ২৫ তারিখে এসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি, ওই শহীদের রক্তের ওপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারেনা। এসেম্বলি কল করেছেন, আমার দাবী মানতে হবে। প্রথম, সামরিক আইন- মার্শাল ল’ উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না। আমি, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারী, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেইজন্য যে সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, ঘোড়ারগাড়ি, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে- শুধু… সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় – তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু – আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবেনা। আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমাদের রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না। মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দুমুসলমান, বাঙালী-ননবাঙালী যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালী রেডিও স্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। ২ ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মায়না-পত্র নেবার পারে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সংগে নিউজ পাঠাতে হলে আপনারা চালাবেন। কিন্তু যদি এ দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম জয় বাংলা।”

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s