গারাংগিয়া মাদ্রাসার ঐতিহাসিক ৩ দিন ব্যাপী সভা ও কিছু কথা

Saiful bin a kalam

বাংলাদেশের অন্যতম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গারাংগিয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসাহযরত বড় হুজুর রহ.(১৮৯৪-১৯৭৭) চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করে তাঁর জন্মস্থান গারাংগিয়াই এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ শাসনাবলে ১৯২০ সালে যার আরো একবছর পর ১৯২১ সালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে হযরত ছোট হুজুর রহ. ()ও দারুল উলুমে কিছুদিন অধ্যয়ন করে পরে গারাংগিয়াই ভর্তি হয়ে হযরত বড় হুজুর রহ. এর তত্ত্বাবধানে থেকে পড়ালেখা শেষ করেন।

সেই থেকে অদ্যবদি অনেক বড় বড় আলেম ও বুজুর্গানে দ্বীনরা এ মাদ্রাসা থেকে বের হয়েছেন। আশেপাশের সমসাময়িক অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি এখনো এগিয়ে। যদিও শাহ্ সাহেব রহ. প্রতিষ্ঠিত সুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা দক্ষিণ চট্টগ্রামে ১নং পজিশনে আছে। আধুনগর ইসলামিয়া মাদ্রাসাও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছে।

গারাংগিয়ার ঐতিহাসিক তিন দিন ব্যাপি সভা একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।প্রতিবছর এই পবিত্র মাহফিলে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মুসলিম ভাইয়েরা আসেন দেশ বরেণ্য ওলামাদের ওয়াজ শুনে ইমানি চেতনাকে উজ্জিবিত করার জন্য।

আশে-পাশে ও দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা গরু, ছাগল, মহিষ ও অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী যেমন; চাল, ডাল, মশলা, বিভিন্ন মৌসুমি তরিতরকারি ও নগদ অর্থ দিয়ে মাহফিলকে সহযোগগিতা করেন। আগত অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য তবরুকের (সু)-ব্যবস্থা করা হয়। সুদক্ষ ভোলান্টায়ার ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে খাবারের দীর্ঘ্য লাইনে অনেক সময় বিশৃঙ্খল অবস্থার তৈরি হয়। যেমন; প্রচুর ধাক্কাধাক্কি ও ফাটা বাঁশের ঘা ইত্যাদি। এই ধরণের মাহফিলে সুন্দর খাবার আঞ্জামের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে কুমিরাগোনা মাহফিল।

সভাকে কেন্দ্র করে এক বিশাল গ্রাম্য মেলা বসে। মজিদিয়া মার্কেটের একটু আগে থেকে শুরু করে মাদ্রাসার পশ্চিম পাশের বিশাল বিলে নানা ধরণের দোকান পাট ও খেলার আসর বসে।শিশুদের জন্য এই মেলাটায় সভা’র প্রধান আকর্ষন। শিশুরা নাগর দোলা, ট্রেন ও ঘোড়ায় চড়ে বেশি আনন্দ পায়। তারা নানা রকম পানীয় শরবত ও আইসক্রিম খেতেও পছন্দ করে যদিও এসব পানীয় শরবত মোটেও স্বাস্থ্যকর না।বেলুন, বাঁশি ও খেলনার গাড়ি কিনেই বাকি টাকা খরচ করে। এলাকার ঐতিহ্য হিসেবে বাচ্চারা বড়দের কাছ থেকে প্রচুর সভা করছ পায়।শিশুদের বাঁশির পে-পো শব্দে অন্য এক আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করে তখন।

এছাড়াও মেলায় প্রচুর কসমেটিক্সের দোকান বসে। যেখানে টিনেজার মেয়েরা বেশি বিড় করে।বিশেষ করে মাগরিবের পর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মেয়েদের ভিড় থাকে। কিছু কিছু বকাটে ছেলেরাও ওখানে ঘোরাঘুরি করে। এসব মেলায় মেয়েদেরকে ঘর থেকে ছাড়া মানে বকাটেদের হাতে নিজের মেয়ে বা বোনকে তুলে দেয়া।প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তারা এসব জায়গাই ইবটিজিং-এর শিকার হচ্ছে। তাছাড়া মানুষের ভিড়ে ফ্রি ডলাডলি তো আছেই।আমি মনে করি এসব কসমেটিক্স সামগ্রীর দোকানগুলি এখানে বসতে না দিলে মাহফিলের পবিত্রতা আরো বেশি বজায় থাকত।

মাহফিল পরিচালনা কমিটির কড়া নিষেধ থাকলেও কিছু কিছু জোয়ার আসরও বসে।ভোলান্টায়ারদের চোখে পড়লে তারা পালিয়ে বেড়ায় বা অনেক সময় মারামারির ঘটনাও হয়।

সভায় কিছু ঔষধ বিক্রেতা ক্যানভাসার বসে যারা বিভিন্ন স্পর্শকাতর রোগের নাম বলে নিজেদের ঔষধ, মলম, তেল, বড়ি ও লতা-পাতা ইত্যাদি বিক্রি করে। অনেকে মাইক নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় কথা বলে তাবিজ বিক্রি করে।কিছু বইয়ের দোকানও দেখা যায় যেখানে বিভিন্ন তাবিজের কিতাব বিক্রি করে। অশিক্ষিত ও অসচেতন মানুষেরা এসব ফাঁদে পা দেই, তারা অনেকেই জানেনা যে ইসলামে তাবিজ-কবজ সর্ম্পূণ নিষেধ।দলিল আরো একটু পর দিচ্ছি…।

দূর-দূরান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভায়েরা হুজুরদ্বয়ের আউলাদদের বাড়িতে ভিড় করে যাড়ঁ-ফুক ও তাবিজ-কবজের জন্য। বাড়ির সামনে কিছু লোক তেল, পানি, রেশম, কলম ও চকোলেটসহ নানা ধরণের জিনিস বিক্রি করছে। যা মানুষ বাড়তি দামে কিনে হুজুরের কাছ থেকে পড়িয়ে নিচ্ছে। আর মানুষ যে যার খুশি মত ৫০০, ১০০০ করে দিচ্ছে। কী অদ্ভুত ব্যবসা! ধর্ম ব্যবসা! পিকে অভিনেতা আমির খানের ভাষায় “ডর-কা-বিজনেস”! যাড়ঁ-ফুক ইসলামে বৈধ হলেও তাবিজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারপরেও আমাদের তথাকথিত পীর সাহেবরা হরদম তাবিজ ব্যবসা করেই যাচ্ছে। আল্লাহর রাসূল স. ধর্মের প্রচার-প্রসার করেছেন, ধর্মীয় ব্যবসা করেন নাই। অনেক বড় বড় সত্য পীর বুজুর্গরা স্ব-হাতে কুরআন লিখে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। অনেকে শিক্ষকতা করেছেন।গারাংগিয়ার বড় হুজুর রহ. ও ছোট হুজুর রহ. নিজেরা শিক্ষকতা করেছেন। অথচ আজকের এসব স্ব-ঘোষিত পীরেরা হুজুর মঞ্জিল ও বড় হুজুরের বাড়ি ইত্যাদি নামীয় অফিস খুলে ঝাড়-ফুক ও তাবিজ ব্যবসা করে চলেছেন।

তাবিজ-কবজ ও ঝাড়ঁ-ফুকের ব্যপারে কিছু কোরআন-হাদিসভিত্তিক দলিল দিয়েই আমার লেখা শেষ করছি।

সাহাবি ইমরান বিন হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত :
একদা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির হাতে তামার চুড়ি দেখে বললেন, এটা কি? সে বলল: এটা অহেনার অংশ। {অহেনার অর্থ এক প্রকার হাড়, যা থেকে কেটে ছোট ছোট তাবিজ আকারে দেয়া হয়।} তিনি বললেন: এটা খুলে ফেল, কারণ এটা তোমার র্দুবলতা বাড়ানো ভিন্ন কিছুই করবে না। যদি এটা বাঁধা অবস্থায় তোমার মৃত্যু হয়, তবে কখনও তুমি সফল হবে না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাকেম ও ইবনে মাজাহ) হাদিসটি সহিহ।

উকবা বিন আমের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি:
‘যে ব্যক্তি তাবিজ লটকালো, আল্লাহ তাকে পূর্ণতা দেবেন না, আর যে কড়ি ব্যবহার করবে, আল্লাহ তাকে মঙ্গল দান করবেন না।’ আহমদ, হাকেম।

উকবা বিন আমের আল-জোহানি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন :
‘একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে একদল লোক উপস্থিত হল। তিনি দলটির নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তার সাথে তাবিজ রয়েছে। অতঃপর তিনি স্বহস্তে তা ছিড়ে ফেললেন এবং তাকে বায়আত করলেন, আর বললেন, যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করল সে শিরক করল।’ সহিহ মুসনাদে আহমদ, হাকেম।

একদা হুজায়ফা রাদিআল্লাহু আনহু এক ব্যক্তির হাতে জ্বরের একটি তাগা দেখতে পেয়ে তা কেটে ফেলেন। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন :
তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে শিরক করা অবস্থায়।’ (ইউসুফ : ১০৬) তাফসিরে ইবনে কাসির। এ থেকে প্রমাণিত হয়, সাহাবি হুজায়ফার মতে তাগা ব্যবহার করা শিরক।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহর স্ত্রী জয়নব রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদিন আব্দুল্লাহ বাড়িতে এসে আমার গলায় তাগা দেখতে পান। তিনি বললেন, এটা কী? আমি বললাম, এটা পড়া তাগা। এতে আমার জন্য ঝাঁড়-ফুঁক দেয়া হয়েছে। তা নিয়ে তিনি কেটে ফেললেন এবং বললেন, আব্দুল্লাহর পরিবার শিরক থেকে মুক্ত। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি :
ঝাড়-ফুঁক, সাধারণ তাবিজ ও ভালোবাসা সৃষ্টির তাবিজ ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক। আহমদ, হাকেম, ইবনে মাজাহ।

তাবেয়ি আব্দুল্লাহ বিন উকাইম সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
যে ব্যক্তি কোন কিছু ধারণ করবে, তাকে ঐ জিনিসের কাছেই সোপর্দ করা হবে।’ আহমদ, তিরমিজি। এ সব দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তাবিজ ব্যবহার করা হারাম ও শিরক।

কেউ যদি তাবিজ-কবচ, মাদুলি-কড়ি, সামুক-ঝিনুক, গিড়া, হাঁড়, তাগা-তামা-লোহা বা অনুরূপ কোন ধাতব বস্তু গলায় বা শরীরের কোথায়ও ধারণ করে এবং এ ধারণা পোষণ করে যে, ঐ গুলো বালা-মুসিবত দূর করার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ক্ষমতা রাখে, তবে তা বড় শিরক। আর যদি এ ধরনের ধারণা না হয়, তবে তা ছোট শিরক।
শায়খ সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ বলেছেন, বালা-মুসিবত দূর করার উদ্দেশ্যে গিড়া, তাগা পরিধান করা ছোট শিরক। অর্থাৎ যদি তা মাধ্যম বা উসিলা মনে করে ব্যবহার করা হয়।
শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ বলেছেন, শয়তানের নাম, হাড়, পূঁতি, পেরেক অথবা তিলিস্মা অর্থাৎ অর্থবিহীন বিদঘুটে  শব্দ বা অক্ষর প্রভৃতি বস্তু দিয়ে তাবিজ বানানো ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ফাতহুল মাজিদ গ্রন্থের টীকায় তিনি আরো বলেছেন : তাবিজ ব্যবহার করা জাহেলি যুগের আমল।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাবিজ-কবচ অনেক ধর্মের প্রতিকি চিহ্ন ছিল। যেমন হিন্দু পুরোহিতদের মাদুলী ধারণ করা, বিশেষ করে কালী শিবের পূজায়। উয়ারী সম্প্রদায়ের আকীদার অন্যতম প্রতিক ছিল বিভিন্ন ধরণের তাবিজ।
শায়খ হাফেজ হেকমি বলেন: ‌’কুরআন ও হাদিস ব্যতীত, ইহুদিদের তিলিসমাতি, মূর্তি পূজারী, নক্ষত্র পূজারী, ফেরেশতা পূজারী এবং জিনের খিদমত গ্রহণকারী বাতিল পন্থীদের তাবিজ ব্যবহার; অনুরূপভাবে পূঁতি, ধনুকের ছিলা, তাগা এবং লোহার ধাতব চুড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক। কারণ, এগুলো সমস্যা সমাধানের বৈধ উপায় কিংবা বিজ্ঞান সম্মত ঔষধ নয়।
এ হল সেসব তাবিজ কবচের হুকুম যাতে কুরাআনের আয়াত, হাদিসের দোয়া দরুদ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় না তার।

আবু বাশীর আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে – তিনি একবার রাসূল (সাঃ) এর সফর সঙ্গী ছিলেন । এ সফরে রাসূল (সাঃ)একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একজন দূত পাঠালেন ।এর উদ্দেশ্য ছিল কোন উটের গলায় যেন ধনুকের কোন রজ্জু লটকানো নচ থাকে অথবা এ জাতীয় রজ্জু যেন কেঁযে ফেলা হয় ।(সহীহ বুখারী , হাদীস নং ৩০০৫ ; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১১৫)

এছাড়াও বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেমগণ যেমন, মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরি, আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদি থেকে শুরু করে অনেক বড় আলেমগণও তাবিজের বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

 

সাইফুৃল বিন আ কালাম

সাবেক ছাত্র (আলিম-২০১০), গারাংগিয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রসা।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s